নতুন জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি কাগজ লাগে? সম্পূর্ণ তালিকা ও ফি

একটা সময় শুধু স্কুলে ভর্তির জন্যই জন্ম সনদের প্রয়োজন হতো। এখন সময় বদলেছে। পাসপোর্ট তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া, বিয়ে রেজিস্ট্রি, এমনকি জমির দলিল করার সময়ও জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। তাই যাদের এখনো জন্ম নিবন্ধন করা হয়নি, তাদের দেরি না করে দ্রুত করে ফেলা উচিত।

তবে সমস্যা হলো, বয়সভেদে কাগজপত্রের চাহিদা আলাদা হয়, ফলে অনেকেই সঠিক তথ্য না জেনে আবেদন করতে গিয়ে বারবার আটকে যান। এই লেখায় বয়স অনুযায়ী প্রতিটি ধাপ আলাদা করে বোঝানো হলো।

শিশুর জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি লাগে, বয়স ০ থেকে ৫ বছর

শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়ম তুলনামূলক সহজ, তবে বয়সের ভিত্তিতে দুটি ভাগ রয়েছে।

শিশুর বয়স ০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে হলে

এই সময়ের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করাই সবচেয়ে সহজ এবং সরকারি ফি সম্পূর্ণ ফ্রি। প্রয়োজন হয়ঃ

  • ইপিআই বা টিকার কার্ডের ফটোকপি
  • হাসপাতালে জন্ম হলে সেখানকার ছাড়পত্র বা বার্থ সার্টিফিকেট
  • বাবা ও মায়ের এনআইডি কার্ডের কপি
  • বাবা মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, বিশেষত ২০০১ সালের পর জন্ম নেওয়া বাবা মায়ের ক্ষেত্রে এটি এখন প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও কিছু ইউনিয়ন বা পৌরসভায় শুধু এনআইডি দিয়েই কাজ চলে যায়
  • শিশুর এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি
  • ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বাসা ভাড়ার রসিদ, হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ বা বিদ্যুৎ বিলের কপি

শিশুর বয়স ৪৬ দিন থেকে ৫ বছরের মধ্যে হলে

  • টিকার কার্ড, হারিয়ে গেলে এমবিবিএস ডাক্তারের প্রত্যয়নপত্র
  • পাসপোর্ট সাইজের এক কপি রঙিন ছবি
  • বাবা মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ ও এনআইডি কার্ড
  • আবাসিক প্রমাণপত্র হিসেবে বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল বা কর পরিশোধের রসিদ

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি লাগে, বয়স ৫ বছরের বেশি

আসল জটিলতা এখানেই তৈরি হয়। যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেছেন কিন্তু এখনো জন্ম নিবন্ধন করাননি, তাদের জন্য নিয়ম কিছুটা কড়াকড়ি।

  • শিক্ষাগত সনদঃ পিএসসি, জেএসসি বা এসএসসি পাসের সার্টিফিকেটের ফটোকপি থাকলে জন্ম তারিখ প্রমাণ করা সহজ হয়
  • ডাক্তারি সনদঃ কোনো শিক্ষাগত সনদ না থাকলে সরকারি হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তারের কাছ থেকে বয়সের প্রত্যয়নপত্র নিতে হয়
  • বাবা মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডিঃ আবেদনকারীর বয়স আঠারোর বেশি হলেও সার্ভার প্রায়ই বাবা মায়ের জন্ম নিবন্ধন নম্বর চায়, তাই বাবা মা জীবিত থাকলে আগে তাদেরটা অনলাইনে করিয়ে নেওয়া ভালো
  • বাবা মা মৃত হলেঃ তাদের মৃত্যু সনদ জমা দিতে হয়, এক্ষেত্রে তাদের জন্ম নিবন্ধন না থাকলেও চলে, তবে মৃত্যু সনদটি অনলাইনে এন্ট্রি থাকলে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়
  • জাতীয় পরিচয়পত্রঃ এনআইডি থাকলে কিন্তু জন্ম নিবন্ধন না থাকলে তার কপি জমা দিতে হয়
  • নাগরিকত্ব সনদঃ স্থানীয় চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদ
  • ঠিকানার প্রমাণঃ হালনাগাদ চৌকিদারি ট্যাক্স বা পৌর করের রসিদ, জমি বা বাসার দলিল অথবা খতিয়ানের কপি

২০০১ সালের আগে ও পরে জন্মের ক্ষেত্রে পার্থক্য

জন্ম সাল অনুযায়ী কাগজের চাহিদায় কিছুটা তারতম্য দেখা যায়।

  • ২০০১ সালের আগে জন্ম হলে অনেক ক্ষেত্রে বাবা মায়ের জন্ম নিবন্ধন ছাড়াও আবেদন গ্রহণ করা হয়, সেক্ষেত্রে তাদের এনআইডি কার্ডের তথ্য দিলেই যথেষ্ট হতে পারে
  • ২০০১ সালের পর জন্ম হলে বাবা মায়ের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন কার্যত বাধ্যতামূলক ধরে নেওয়া ভালো

তবে নিয়ম ইউনিয়ন বা পৌরসভা ভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তাই আবেদনের আগে স্থানীয় নিবন্ধকের সাথে একবার কথা বলে নেওয়া নিরাপদ।

জন্ম নিবন্ধন করার ধাপ

  • bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন অপশনে প্রবেশ করুন
  • প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফর্ম পূরণ করুন, নাম, জন্ম তারিখ, পিতা মাতার তথ্য ও ঠিকানা সঠিকভাবে লিখুন
  • সচল একটি মোবাইল নম্বর দিন, কারণ যাচাইয়ের জন্য ওটিপি পাঠানো হবে
  • প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের স্ক্যান কপি বা স্পষ্ট ছবি আপলোড করুন
  • আবেদন সাবমিট করে ফর্মটি প্রিন্ট করে নিন
  • প্রিন্ট করা ফর্মের সাথে কাগজপত্রের ফটোকপি যুক্ত করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর অফিসে জমা দিন

জন্ম নিবন্ধনের সরকারি ফি

দালালের খপ্পরে পড়ে বাড়তি টাকা দেওয়ার দরকার নেই, সরকার নির্ধারিত ফি বেশ কম।

আবেদনের পর করণীয়

  • আবেদনের অ্যাপ্লিকেশন আইডি সংরক্ষণ করুন, এটি দিয়ে পরে আবেদনের অবস্থা যাচাই করা যায়
  • অফিসে জমা দেওয়ার পর একটি প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ বা ট্র্যাকিং নম্বর নিয়ে রাখুন
  • সনদ ইস্যু হওয়ার পর everify.bdris.gov.bd থেকে তথ্য মিলিয়ে দেখুন, কোনো বানান বা তথ্যগত ভুল থাকলে দ্রুত সংশোধনের আবেদন করুন

সাধারণ কিছু ভুল যা এড়ানো জরুরি

  • নামের বানানে অসঙ্গতিঃ বাবা মায়ের এনআইডি বা স্কুল সার্টিফিকেটের সাথে মিলিয়ে বাংলা ও ইংরেজি বানান হুবহু এক রাখা উচিত, সামান্য ভুল হলে পরে সংশোধনের জন্য অনেক সময় নষ্ট হয়
  • বাবা মায়ের নিবন্ধন আগে থেকে না করানোঃ নিজেরটা জমা দেওয়ার আগে বাবা মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন প্রস্তুত আছে কি না তা যাচাই করে নিন
  • অস্পষ্ট বা পুরনো ডকুমেন্ট আপলোড করাঃ ঝাপসা ছবি দিলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
  • ঠিকানার প্রমাণ হালনাগাদ না রাখাঃ পুরনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ রসিদ জমা দিলে আবেদন আটকে যেতে পারে

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সেক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তারের বয়স প্রত্যয়নপত্র বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

তাদের মৃত্যু সনদ জমা দিলেই চলে, আলাদা করে তাদের জন্ম নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক নয়, তবে মৃত্যু সনদ অনলাইনে এন্ট্রি থাকলে যাচাই সহজ হয়।

সাধারণত কাগজপত্র ঠিক থাকলে কয়েক কর্মদিবসের মধ্যেই নিবন্ধন সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে এলাকাভেদে ও অফিসের কাজের চাপের ওপর ভিত্তি করে সময় কমবেশি হতে পারে।

বর্তমানে আবেদন প্রক্রিয়া মূলত অনলাইনভিত্তিক, অনলাইনে ফর্ম পূরণ করে প্রিন্ট করা কপি নিয়ে অফিসে জমা দিতে হয়।

শেষ কথা

জন্ম নিবন্ধন একজন নাগরিকের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। বয়স অনুযায়ী সঠিক কাগজপত্র আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে আবেদন প্রক্রিয়া অনেক সহজ ও দ্রুত হয়ে যায়। তাই অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র প্রস্তুত রেখে আজই আবেদন করে ফেলুন।