অনলাইনে জন্মনিবন্ধনের আবেদন পদ্ধতি ২০২৬ (হালনাগাদ নিয়ম)

নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন এখন আর আগের মতো ঝামেলার নয়। মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করা যায়, শুধু কয়েকটি কাগজপত্র নিয়ে পরে স্থানীয় অফিসে জমা দিলেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।

তবে প্রথমবার আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই বুঝতে পারেন না ঠিক কোন ধাপে কী তথ্য দিতে হবে, কোথায় ভুল হওয়ার ঝুঁকি বেশি, বা সাবমিট করার পর কী করণীয়। এই লেখায় পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সহজভাবে বোঝানো হয়েছে, যাতে প্রথমবারেই সঠিকভাবে আবেদন সম্পন্ন করা যায়।

নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে বেদন করুন

আবেদনের আগে কি কি তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন

আবেদন শুরু করার আগেই নিচের তথ্য ও কাগজপত্র হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন, এতে মাঝপথে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

শিশুর জন্মের প্রমাণপত্র

জন্ম কোথায় হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে প্রমাণপত্র আলাদা হতে পারে।

  • হাসপাতালে জন্ম হলে হাসপাতালের জন্ম সনদ বা সার্টিফিকেট
  • বাসায় জন্ম হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউপি সদস্যের জন্ম প্রত্যয়নপত্র

এই কাগজটি জন্ম তারিখ, সময়, লিঙ্গ ও মায়ের নাম নিশ্চিত করার কাজে লাগে।

বাবা মায়ের এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন

শিশুর তথ্য যাচাইয়ের জন্য বাবা মায়ের পরিচয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

  • উভয় অভিভাবকের এনআইডি থাকলে সবচেয়ে ভালো
  • এনআইডি না থাকলে অন্তত তাদের জন্ম নিবন্ধন নম্বর প্রয়োজন হবে
  • নাম, জন্ম তারিখ ও ঠিকানা, সব তথ্য প্রতিটি কাগজে একই থাকা জরুরি

ঠিকানার প্রমাণ

শিশুর জন্ম নিবন্ধন কোন ইউনিয়ন বা পৌরসভায় হবে তা নির্ধারণের জন্য বাসস্থানের তথ্য লাগে।

  • বাবা মায়ের এনআইডির ঠিকানা
  • অথবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সার্টিফিকেট, যেখানে আবেদন করা হবে

শিশুর নাম, বাংলা ও ইংরেজি

ফর্ম পূরণের সময় শিশুর পূর্ণ নাম সঠিকভাবে দিতে হয়, বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই। ইংরেজি নামের বানান পরবর্তীতে পাসপোর্টের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, তাই শুরু থেকেই সতর্কভাবে দেওয়া উচিত।

অভিভাবকের সচল মোবাইল নম্বর

আবেদনের ওটিপি, আপডেট ও ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত সব বার্তা অভিভাবকের মোবাইল নম্বরে আসে, তাই একটি সক্রিয় নম্বর দেওয়া আবশ্যক।

ফর্মে প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য

  • শিশুর জন্ম তারিখ ও জন্মস্থান
  • বাবা মায়ের পেশা
  • বাবা মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা
  • শিশুর লিঙ্গ
  • পরিবারের সদস্যসংখ্যা

এসব তথ্য সঠিকভাবে দিলে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়।

অনলাইনে আবেদন ফর্ম পূরণ করার ধাপ

পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি ধাপে সঠিক তথ্য দিলে আবেদন দ্রুত ভেরিফাই হয়।

ধাপ ১, শিশুর পরিচিতি ও জন্মস্থানের ঠিকানা দিন

bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে আবেদন ফর্মে যান। প্রথমেই নির্বাচন করতে হবে জন্ম নিবন্ধন কোন ঠিকানায় করতে চান। সাধারণত শিশুর জন্ম যে এলাকায় হয়েছে বা পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা যেখানে, সেই ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনই নির্বাচন করতে হয়। ভুল এলাকা সিলেক্ট করলে আবেদন পরে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় বা বাতিলও হয়ে যেতে পারে।

জন্ম সনদের আবেদন

এরপর শিশুর নাম লেখার সময় কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়ঃ

  • নাম দুই ভাগ হলে প্রথম অংশ প্রথম ঘরে, শেষ অংশ শেষ ঘরে বসবে
  • নাম তিন ভাগ হলে প্রথম দুটি অংশ প্রথম ঘরে, শেষ অংশ শেষ ঘরে বসবে
  • নাম এক শব্দ হলে শুধু শেষ অংশের ঘরটি পূরণ করতে হবে, প্রথম অংশ খালি থাকবে
জন্ম সনদ যাচাইয়ের আবেদন

একই নিয়ম ইংরেজি নামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সব তথ্য পূরণ শেষে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করে পরের ধাপে যান।

ধাপ ২, পিতা ও মাতার তথ্য দিন

এই ধাপে বাবা মায়ের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জাতীয়তা সিলেক্ট করলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের নাম দেখিয়ে দেয়। এই নাম সরকারি ডাটাবেস থেকে আসে বলে সরাসরি এডিট করার সুযোগ থাকে না।

তাই আবেদন শুরুর আগেই নিশ্চিত হয়ে নেওয়া জরুরি যে বাবা মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ অনলাইনে আপডেট করা আছে কি না। তাদের নিবন্ধন নম্বর অনলাইনে না থাকলে শিশুর আবেদন এগোবে না, সেক্ষেত্রে আগে বাবা মায়ের সনদ অনলাইন করিয়ে তারপর শিশুর আবেদন জমা দিতে হয়।

নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করুন | ২০২৬

তবে শিশুর জন্ম সাল ২০০০ বা তার আগে হলে ব্যতিক্রম রয়েছে, সেক্ষেত্রে বাবা মায়ের অনলাইন নিবন্ধন নম্বর বাধ্যতামূলক নয়, সরাসরি নাম লিখে দিলেও আবেদন সম্পন্ন করা যায়।

ধাপ ৩, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দিন

এই ধাপে পরিবারের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দুটোই সঠিকভাবে দিতে হয়। ঠিকানার তথ্যের ভিত্তিতেই আবেদন কোন অফিসে যাবে এবং কে তা ভেরিফাই করবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়।

স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দিন
  • জন্মস্থান ও স্থায়ী ঠিকানা একই হলে নির্দিষ্ট বক্সে টিক দিলে বারবার লেখার প্রয়োজন হয় না
  • বর্তমান ঠিকানা স্থায়ী ঠিকানার মতোই হলে সেই বক্সেও টিক দেওয়া যায়
  • ঠিকানা আলাদা হলে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও সংশ্লিষ্ট এলাকা ম্যানুয়ালি নির্বাচন করে পূরণ করতে হয়

ধাপ ৪, আবেদনকারীর তথ্য দিন

এই ধাপে আবেদনটি যিনি সম্পন্ন করছেন তার তথ্য দিতে হয়। শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত পিতা, মাতা বা আইনগত অভিভাবক আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত হন।

  • প্রাপ্তবয়স্ক নিজের জন্য আবেদন করলে নিজে অপশন সিলেক্ট করবেন
  • অন্য কেউ আবেদন সম্পন্ন করলে আবেদনকারী ও নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির সম্পর্ক সঠিকভাবে সিলেক্ট করতে হবে, যেমন পিতা, মাতা, ভাই, বোন বা অভিভাবক
আবেদনকারীর তথ্য দিন

আবেদনকারীর সচল মোবাইল নম্বরও এই ধাপে দিতে হয়, কারণ সব নোটিফিকেশন ও ওটিপি এই নম্বরেই আসবে।

ধাপ ৫: ডকুমেন্ট আপলোড করুন

আবেদনের এই শেষ ধাপে আপনাকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো আপলোড করতে হবে। যদি আবেদনটি একজন শিশুর জন্য করা হয়, তাহলে টিকা কার্ডের স্ক্যান কপি অথবা জমি বা বাড়ির ট্যাক্স রশিদ সংযুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে আপনি একাধিক ফাইল আপলোড করতে পারবেন, তবে খেয়াল রাখতে হবে প্রতিটি ফাইলের সাইজ যেন ১০০ কেবির কম হয়। অতিরিক্ত ডকুমেন্ট যুক্ত করতে হলে Add বাটনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৬, আবেদনপত্র প্রিন্ট করুন

সব তথ্য সফলভাবে সাবমিট হলে আবেদনপত্র প্রিন্ট করার অপশন আসবে। এই কপিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দিতে হবে।

প্রিন্ট করার সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুনঃ

  • প্রিন্ট ডায়ালগে Headers and Footers অপশন অবশ্যই চালু রাখুন
  • হেডারে থাকা Application ID পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে কি না নিশ্চিত করুন, কারণ এটিই আবেদন ট্র্যাক করার একমাত্র শনাক্তকারী নম্বর
  • প্রিন্ট শেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যেমন জন্মের প্রমাণপত্র ও বাবা মায়ের এনআইডি বা নিবন্ধনের কপি, আবেদন ফর্মের সাথে সংযুক্ত করুন
আবেদনপত্র প্রিন্ট করুন

কাগজপত্র সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিলেই অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যায়।

আবেদন সাবমিট করার পর করণীয়

  • অফিসে জমা দেওয়ার পর একটি প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ চেয়ে নিন
  • Application ID সংরক্ষণ করুন, ভবিষ্যতে আবেদনের অবস্থা যাচাইয়ের জন্য এটি প্রয়োজন হবে
  • সনদ ইস্যু হওয়ার পর everify.bdris.gov.bd থেকে সব তথ্য একবার মিলিয়ে দেখে নিন

জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরম ডাউনলোড করুন

জন্ম নিবন্ধন ফরম — ডাউনলোড

জন্ম নিবন্ধনের খরচ

শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করলে এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়। এই সময়সীমা পার হয়ে গেলে একটি বিলম্ব ফি প্রযোজ্য হয়, যার পরিমাণ নির্ভর করে নিবন্ধনের সময় শিশুর বয়স কত তার ওপর। এছাড়া সনদে কোনো সংশোধনী আনতে চাইলে বা অতিরিক্ত কপি নিতে চাইলে আলাদা চার্জও গুনতে হতে পারে।

বয়স অনুযায়ী নিবন্ধন ফি

বয়সসীমাফি (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে)ফি (প্রবাসীদের ক্ষেত্রে)
০ থেকে ৪৫ দিনবিনামূল্যেবিনামূল্যে
৪৬ দিন থেকে ৫ বছর২৫ টাকা১ ডলার
৫ বছরের বেশি৫০ টাকা১ ডলার


অন্যান্য ফি

  • জন্ম সনদের কপি (বাংলা বা ইংরেজি): বাংলাদেশে ৫০ টাকা, প্রবাসে ১ ডলার
  • জন্ম তারিখ সংশোধন: বাংলাদেশে ১০০ টাকা, প্রবাসে ২ ডলার
  • অন্যান্য তথ্য সংশোধন: বাংলাদেশে ৫০ টাকা, প্রবাসে ১ ডলার

Read: অনলাইনে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করার নিয়ম
Read: জন্মনিবন্ধনের ফি সম্পর্কে বিস্তারিত
Read: জন্মনিবন্ধন বাংলা থেকে ইংরেজি করার পদ্ধতি
Read: জন্মনিবন্ধন সনদ হারিয়ে গেলে করণীয়

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হ্যাঁ, আপনি অফিসিয়াল BDRIS পোর্টালের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আবেদন প্রক্রিয়াটি অনলাইনেই সম্পন্ন করতে পারবেন, কোনো অফিসে সশরীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করলে এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এরপর শিশুর বয়স অনুযায়ী বিলম্ব ফি প্রযোজ্য হয়, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

একজন শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত টিকা কার্ডের স্ক্যান কপি অথবা জমি বা বাড়ির ট্যাক্স রশিদ আপলোড করতে হয়, পাশাপাশি আবেদনের ধরন অনুযায়ী আরও কিছু ডকুমেন্ট লাগতে পারে।

হ্যাঁ, প্রতিটি ডকুমেন্টের সাইজ অবশ্যই ১০০ কেবির কম হতে হবে। Add বাটনে ক্লিক করে আপনি একাধিক ফাইল সংযুক্ত করতে পারবেন।

আপনি যেকোনো সময় bdris.gov.bd/br/application/status এই পোর্টালে গিয়ে আপনার আবেদনের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে স্ট্যাটাস যাচাই করতে পারবেন।

আবেদন অনুমোদিত হওয়ার পর, আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে আপনার নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশন অফিস থেকে সনদটি সংগ্রহ করতে হবে।

আবেদনে কোনো ভুল পাওয়া গেলে সেটি বাতিল হয়ে যেতে পারে, এবং পুনরায় নতুন আবেদন করার জন্য আপনাকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

শেষ কথা

অনলাইনে নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করা মোটেও কঠিন কিছু নয়, যদি সঠিক নিয়ম মেনে করা হয়। আগে থেকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো প্রস্তুত রাখলে এবং প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সাথে অনুসরণ করলে অহেতুক বিলম্ব এড়ানো যায় এবং আবেদনটি দ্রুত অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। জন্ম নিবন্ধন যাচাই, সংশোধন কিংবা ডাউনলোড সংক্রান্ত আরও সহায়তার জন্য আমাদের সম্পূর্ণ জন্ম সনদ সংক্রান্ত গাইডগুলো দেখে নিতে পারেন।