অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য আবেদন করুন | সহজ ধাপসমূহ ২০২৬

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের প্রক্রিয়া এখন অনেকটাই অনলাইনভিত্তিক হয়ে গেছে, তবু প্রথমবার করতে গেলে অনেকের কাছে বিষয়টি জটিল মনে হয়। নামের বানান ভুল, জন্ম তারিখ মিলছে না, বাবা মায়ের নাম ভুলভাবে লেখা, এই ধরনের সমস্যা জন্ম নিবন্ধনে খুবই সাধারণ। কিন্তু সঠিক নিয়ম না জানা থাকলে অনেকেই বুঝতে পারেন না কোথা থেকে শুরু করবেন বা কোন ধাপে কী তথ্য লাগবে।

এই লেখায় সংশোধনের পুরো অনলাইন প্রক্রিয়া একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে, যাতে প্রথমবার আবেদন করলেও কোনো ভুল না হয়।.

অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য আবেদন করুন।

জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কি কি লাগে

সংশোধনের ধরন অনুযায়ী কাগজপত্রের চাহিদা কমবেশি হয়। সাধারণভাবে যেসব কাগজ প্রয়োজন হয়ঃ

  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট, যদি প্রযোজ্য হয়
  • সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার বা চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র
  • বিশেষ ক্ষেত্রে মেডিকেল সার্টিফিকেট
  • পিতা মাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র
  • কিছু ক্ষেত্রে হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ

সব ক্ষেত্রে সব নথিপত্রের প্রয়োজন হয় না; যে সুনির্দিষ্ট তথ্যটি সংশোধন করা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রয়োজনীয় সহায়ক নথিপত্র ও ফি নির্ধারণ করা হয়।

অনলাইনে সংশোধনের আবেদন করার ধাপ

জন্ম নিবন্ধন সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করার আগে, প্রথমেই আপনাকে যাচাই করে দেখতে হবে আপনার তথ্য অনলাইনে বিদ্যমান কিনা। পুরো প্রক্রিয়াটি আটটি ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে প্রতিটি ধাপ সহজভাবে দেখানো হলো।

ধাপ ১ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

bdris.gov.bd/br/correction এই ঠিকানায় প্রবেশ করুন। ওয়েবসাইট খুললে উপরের মেনুতে জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধন আবেদন নামে একটি অপশন পাবেন, সেখানে ক্লিক করলেই সংশোধনের মূল পেজে চলে যাবেন।

অনলাইনে সংশোধনের আবেদন করার ধাপ

ধাপ ২ নিবন্ধন নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে তথ্য বের করুন

নির্দিষ্ট ঘরে ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ বসিয়ে অনুসন্ধান বাটনে ক্লিক করুন।

  • নম্বরটি ১৭ ডিজিটের না হলে বুঝতে হবে নিবন্ধনটি এখনো অনলাইনে যুক্ত হয়নি, এক্ষেত্রে আগে সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে সনদটি অনলাইন করিয়ে নিতে হবে
  • অনুসন্ধানের পর স্ক্রিনে প্রাথমিক তথ্য দেখাবে, নাম ও জন্ম তারিখ ভালো করে মিলিয়ে নিন
  • সব ঠিক থাকলে নির্বাচন করুন বাটনে ক্লিক করে পরবর্তী ধাপে যান
নিবন্ধন নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে তথ্য বের করুন

ধাপ ৩ কী পরিবর্তন করবেন তা নির্বাচন করুন

  • Information Type থেকে আপনি যে তথ্যটি পরিবর্তন করতে চান তা বেছে নিন, যেমন নাম, জন্ম তারিখ, লিঙ্গ, পিতামাতার নাম অথবা জাতীয়তা
  • সঠিক তথ্যটি Value ঘরে টাইপ করুন
  • কেন পরিবর্তন করছেন তার কারণ নির্বাচন করুন (সাধারণত “Incorrectly Entered”)
  • একাধিক তথ্য সংশোধন করতে চাইলে Add More বাটনে ক্লিক করে আরও ঘর যুক্ত করুন

ধাপ ৪ নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করুন

যে অফিস থেকে জন্ম নিবন্ধন সনদটি তৈরি হয়েছিল সেই কার্যালয় এখানে নির্বাচন করতে হয়।

  • দেশ
  • বিভাগ
  • জেলা
  • সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলা

এই ধারাবাহিকতা মেনে নির্বাচন করার পর সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ সিলেক্ট করে অফিসটি যাচাই করুন এবং পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।

ধাপ ৫ ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য পূরণ করুন

  • আপনার স্থায়ী ঠিকানাটি লিখুন, খেয়াল রাখবেন এটি বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই দিতে হবে।
  • এরপর আপনার বর্তমান ঠিকানার সঠিক তথ্য দিন।
  • স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা একই হলে বারবার লেখার প্রয়োজন নেই, শুধু “স্থায়ী এবং বর্তমান ঠিকানা একই” বক্সটি টিক দিলেই হবে।
  • পরের ধাপে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে তারকা চিহ্নিত (*) সবগুলো ঘর পূরণ করা হয়েছে।

ধাপ ৬ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করুন

  • ডকুমেন্ট আপলোড করতে Add File বাটনে ক্লিক করুন।
  • সঠিক ফাইল টাইপ এবং সাব-টাইপ নির্বাচন করুন, যেমন বাবার জন্ম সনদ, মায়ের সনদ, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা স্কুল সার্টিফিকেট।
  • শুধুমাত্র ছবি ফরম্যাটের ফাইল গ্রহণযোগ্য, JPG, JPEG অথবা PNG, এবং প্রতিটি ফাইলের সাইজ অবশ্যই ২ এমবির মধ্যে থাকতে হবে।
  • আপলোড সম্পন্ন করতে Start বাটনে ক্লিক করুন।
  • এগিয়ে যাওয়ার আগে নিশ্চিত করুন ফাইলটির স্ট্যাটাসে “Uploaded successfully” দেখাচ্ছে কিনা।

ধাপ ৭: আবেদনকারীর তথ্য পূরণ করুন

  • আবেদনকারীর সাথে আপনার সম্পর্ক নির্বাচন করুন, যেমন নিজে, বাবা, মা, অভিভাবক অথবা অন্য কোনো সম্পর্ক।
  • আবেদনকারীর পুরো নাম লিখুন।
  • একটি সচল মোবাইল নম্বর দিন যেখানে মেসেজ গ্রহণ করা যাবে।
  • Send OTP বাটনে ক্লিক করুন, এরপর কোডটি পাওয়ার পর সেটি নির্দিষ্ট ঘরে লিখুন।
  • সবকিছু সঠিক থাকলে এগিয়ে যেতে Submit বাটনে ক্লিক করুন।

ফি পরিশোধ করার পর সব তথ্য আরেকবার ভালোভাবে দেখে নিন, এরপর Submit বাটনে ক্লিক করুন। এরপর স্ক্রিনে যে আবেদন নম্বরটি দেখানো হবে, সেটি অবশ্যই সংরক্ষণ করে রাখুন।

ধাপ ৮: আবেদন ফরম প্রিন্ট করে জমা দিন

অনলাইনে ফরম সাবমিট করার পর, সেটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন। প্রিন্ট করা কপির সাথে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিন, যেমন:

  • ইউনিয়ন পরিষদ
  • পৌরসভা
  • সিটি কর্পোরেশন

আবেদনের অবস্থা পরে যাচাই করার জন্য আপনার অ্যাপ্লিকেশন আইডি এবং রেফারেন্স নম্বরটি অবশ্যই সংরক্ষণ করে রাখুন।

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের ফি, দেশে ও বিদেশে

সংশোধনের ধরন অনুযায়ী সরকারি ফি নির্ধারিত আছে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখুনঃ

  • জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে ফি তুলনামূলক বেশি হতে পারে এবং অতিরিক্ত প্রমাণপত্র লাগতে পারে
  • বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সংশোধনের আবেদন ও ফি বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়
  • ফি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট অফিস বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া ভালো

আরও পড়ুন: হারানো জন্ম সনদ
আরও পড়ুন: জন্ম সনদের ফি ২০২৬
আরও পড়ুন: নতুন জন্ম সনদ নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আরও পড়ুন: জন্ম সনদ বাংলা থেকে ইংরেজিতে রূপান্তর

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

জন্ম তারিখ ছাড়া অন্যান্য তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি সাধারণত ৫০ টাকা। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে সংশোধন করতে ১ মার্কিন ডলার ফি প্রযোজ্য।

সাধারণত ৫ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধন সম্পন্ন হয়। তবে অফিসের কাজের চাপ, ডকুমেন্ট যাচাই বা বিশেষ ক্ষেত্রে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে।

একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ সর্বোচ্চ ৪ বার পর্যন্ত সংশোধন করা যায়। অপ্রয়োজনীয় বা বারবার সংশোধনের আবেদন করলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে, তাই তথ্য দেওয়ার সময় সতর্ক থাকা ভালো।

হ্যাঁ, প্রমাণপত্র হিসেবে পাসপোর্ট ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে নাম বা জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে এটি একটি গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনলাইনে আবেদনের পর ফরমটি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে সরাসরি জমা দিতে হয়।

শেষ কথা

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণ করলে খুব একটা কঠিন মনে হয় না। সঠিক কাগজপত্র প্রস্তুত রেখে প্রতিটি ধাপে তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে এগোলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।